খাগড়াছড়িপার্বত্য অঞ্চল

৪৭তম জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহ শুরু

 খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি:
উদ্ভাবননির্ভর বাংলাদেশ গঠনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি,”এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে খাগড়াছড়িতে শুরু হয়েছে ৪৭তম জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহ। জেলা প্রশাসনের আয়োজনে, জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যাদুঘরের তত্ত্বাবধানে এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত এ কর্মসূচি শনিবার (১৮ এপ্রিল) সকালে জেলা শহরের অফিসার্স ক্লাব মিলনায়তনে উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।

 

অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হাসান মারুফের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে ফিতা কেটে ও বেলুন উড়িয়ে সপ্তাহব্যাপী এ আয়োজনের উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত। এ সময় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান এবং খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজের উপাধ্যক্ষ মো. আতিকুর রহমান।

 

উদ্বোধনী মঞ্চে বক্তাদের কথায় উঠে আসে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়ার রূপরেখা, যেখানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিই হবে অগ্রগতির মূল চালিকা শক্তি।

 

প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত বলেন,“আজকের এই ক্ষুদে শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের বিজ্ঞানী, উদ্ভাবক ও প্রযুক্তিনেতা। তোমরা স্বপ্ন দেখো,আজ থেকে তোমরা যখন বড় হবে,তখন বিজ্ঞানের গবেষণা পুরো পৃথিবীকে তাক লাগিয়ে দিবে।

 

তোমাদের হাত ধরেই একদিন বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে নতুন উদ্ভাবনের দেশ হিসেবে পরিচিতি পাবে। আমরা এমন এক প্রজন্ম চাই, যারা শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার করবে না, বরং প্রযুক্তি তৈরি করবে। গবেষণার প্রতি আগ্রহ বাড়াতে হবে, ব্যর্থতাকে ভয় না পেয়ে নতুন কিছু করার সাহস রাখতে হবে। মনে রেখো, একটি ছোট আইডিয়াই পৃথিবী বদলে দিতে পারে।”

 

তিনি আরও বলেন,“সরকার বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসারে কাজ করছে, কিন্তু সেই সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে তোমাদেরই। আজকের এই আয়োজন শুধু প্রদর্শনী নয়, এটি তোমাদের মেধা বিকাশের একটি বড় প্ল্যাটফর্ম। এখান থেকেই হয়তো জন্ম নেবে এমন কোনো উদ্ভাবন, যা একদিন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাবে।”

 

অন্যান্য বক্তারা বলেন, টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কোনো বিকল্প নেই। নতুন প্রজন্মকে উদ্ভাবনী চিন্তায় উদ্বুদ্ধ করা এবং প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা অর্জনে এ ধরনের আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তারা শিক্ষার্থীদের গবেষণামুখী করে তুলতে বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসার ও ব্যবহারিক জ্ঞান বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

 

এবারের বিজ্ঞান সপ্তাহে জেলার ৯টি উপজেলা থেকে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করছে। প্রতিটি উপজেলা থেকে ৬টি করে মোট ৫৪টি উদ্ভাবনী প্রজেক্ট প্রদর্শিত হচ্ছে, যেখানে দেখা মিলছে সৃজনশীল চিন্তা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও ভবিষ্যৎ ভাবনার অনন্য সমন্বয়।

 

মেলায় অংশ নেওয়া ক্ষুদে বিজ্ঞানীদের চোখেমুখে ছিল স্বপ্ন আর আত্মবিশ্বাসের ঝিলিক।খাগড়াছড়ি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী তন্ময় ত্রিপুরা তার প্রজেক্ট নিয়ে বলেন,“আমি একটি স্মার্ট কৃষি সেচ ব্যবস্থা তৈরি করেছি, যা মাটির আর্দ্রতা বুঝে নিজে থেকেই পানি দেবে। এতে পানি অপচয় কমবে এবং কৃষকরা সহজে ফসল ফলাতে পারবে। ভবিষ্যতে আমি এটিকে আরও উন্নত করতে চাই।”

 

মাটিরাঙ্গা উপজেলার ছাত্রী নুসরাত জাহান জানায়,“আমার প্রজেক্টটি একটি পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদন পদ্ধতি নিয়ে। আমরা যদি ছোট ছোট উদ্যোগ নেই, তাহলে গ্রাম পর্যায়েও নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করা সম্ভব। আমি চাই আমার কাজ মানুষের কাজে লাগুক।”

 

দীঘিনালা থেকে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী ক্রিসেন্টি চাকমা বলেন,“আমরা একটি কম খরচের পানি বিশুদ্ধকরণ যন্ত্র তৈরি করেছি। পাহাড়ি এলাকায় বিশুদ্ধ পানির সমস্যা রয়েছে। আমাদের এই উদ্ভাবন যদি বাস্তবে প্রয়োগ করা যায়, তাহলে অনেক মানুষের উপকার হবে।”

 

বিজ্ঞান মেলার প্রতিটি স্টলে ঘুরে দেখা যায় শিক্ষার্থীদের অক্লান্ত পরিশ্রম, সৃজনশীলতা ও বাস্তব সমস্যার সমাধান খোঁজার চেষ্টা। কোথাও স্মার্ট প্রযুক্তি, কোথাও পরিবেশবান্ধব উদ্ভাবন,সব মিলিয়ে পুরো আয়োজন যেন এক প্রাণবন্ত জ্ঞানমেলার রূপ নিয়েছে।

 

খাগড়াছড়িতে এই বিজ্ঞান উৎসব শুধু একটি আনুষ্ঠানিক আয়োজন নয়, বরং এটি নতুন প্রজন্মের স্বপ্ন দেখার, ভাবনার জগৎ প্রসারিত করার এবং উদ্ভাবনী বাংলাদেশ গড়ার পথে এক শক্তিশালী পদক্ষেপ,এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Related Articles

Back to top button