জাতীয়সারাদেশ

মোংলা বন্দরে ৩ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন প্রধানমন্ত্রীর

চার বছরে নির্মিত হবে দুটি আধুনিক জেটি, বছরে ৪ লাখ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের লক্ষ্য

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলার সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়নে প্রায় ৩ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া উন্নয়ন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বন্দরে বছরে চার লাখ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা তৈরি হবে। পাশাপাশি দুটি আধুনিক জেটি নির্মাণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহনে মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়বে।

 

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকাল ১০টায় মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের ৯ নম্বর জেটিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ‘মোংলা বন্দরের সুবিধাদি সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী।

 

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নৌপরিবহন, সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান, বন, পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী লায়ন ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদিন ফারুক, ইনভেস্ট বাংলাদেশ চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন এবং নৌপরিবহন সচিব মো. আতাউর রহমান খান।

 

চীনের পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের (সিআরসিসি) চেয়ারম্যান Dai Hegen, বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা দূতাবাসের ইকোনমিক অ্যান্ড কমার্শিয়াল কাউন্সেলর Song Yang এবং চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের (সিসিইসিসি) চেয়ারম্যান Li Chongyang। এ ছাড়া সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও আমদানি-রপ্তানিসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা।

 

অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করা হয়। পরে প্রকল্পের নির্মাণ পরিকল্পনা ও বিভিন্ন অবকাঠামো নিয়ে সিসিইসিসির তৈরি একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। এরপর প্রধানমন্ত্রী প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। অনুষ্ঠান শেষে তিনি অনুষ্ঠানস্থলের পাশে একটি বৃক্ষরোপণ করেন। পরে দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনায় দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।

 

 

প্রকল্পে থাকবে দুটি আধুনিক জেটি

প্রকল্পটির নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৩৫ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩ হাজার ৫৯২ কোটি ৯০ লাখ টাকা। বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা হয়েছে চার বছর।

 

প্রকল্পের আওতায় ১০ ও ১১ নম্বর জেটি নির্মাণ, কনটেইনার লোডিং-আনলোডিং ইয়ার্ড, বিপজ্জনক পণ্য রাখার ইয়ার্ড, প্রশাসনিক ভবন, কনটেইনার ফ্রেইট স্টেশন (সিএফএস) এবং অভ্যন্তরীণ সড়ক নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি আধুনিক কনটেইনার ব্যবস্থাপনার জন্য ৪৯টি প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম যুক্ত করা হবে।

 

প্রকল্পের আওতায় নির্মিতব্য জেটির দৈর্ঘ্য হবে ৩৬৮ মিটার এবং প্রস্থ ৪০ মিটার। এতে একসঙ্গে ২০ হাজার ডেডওয়েট টন (ডিডব্লিউটি) ধারণক্ষমতার দুটি জাহাজ অথবা ৫০ হাজার ডিডব্লিউটি ধারণক্ষমতার একটি জাহাজ ভেড়ানো যাবে।

 

প্রকল্পের মোট আয়তন ২ লাখ ২৭ হাজার বর্গমিটার। এর মধ্যে লোডেড কনটেইনার ইয়ার্ড ৮৭ হাজার ৬০০ বর্গমিটার, খালি কনটেইনার ইয়ার্ড ৩৪ হাজার ১৭০ বর্গমিটার, বিপজ্জনক কনটেইনার ইয়ার্ড ৪ হাজার ২৬০ বর্গমিটার, অভ্যন্তরীণ সড়ক ৫০ হাজার ৪০০ বর্গমিটার, প্রশাসনিক ভবন ২ হাজার ৫১৭ বর্গমিটার এবং সিএফএস ৩ হাজার ৯০৯ বর্গমিটার।

 

এ ছাড়া প্রকল্পে চারটি শোর-টু-শিপ ক্রেন, সাতটি আরটিজি, ১০টি টার্মিনাল ট্রাক্টর, ১০টি টার্মিনাল ট্রেইলার, দুটি এম্পটি হ্যান্ডলার, একটি রিচ স্ট্যাকার, একটি কনটেইনার ওজনযন্ত্র এবং একটি ফিক্সড কনটেইনার স্ক্যানার স্থাপন করা হবে।

 

 

বছরে চার লাখ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের লক্ষ্য

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে মোংলা বন্দরে প্রতি ঘণ্টায় ৩০টি কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা সম্ভব হবে। বার্ষিক হ্যান্ডলিং সক্ষমতা দাঁড়াবে চার লাখ টিইইউতে। এতে কনটেইনার ব্যবস্থাপনার ব্যয় কমার পাশাপাশি পণ্য সংরক্ষণ ও জাহাজ থেকে পণ্য ওঠানো-নামানোর সক্ষমতা বাড়বে।

 

প্রকল্পে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। এর মাধ্যমে মোংলা বন্দরকে দেশের প্রথম স্মার্ট বন্দর হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম সহজ হবে এবং বন্দর ব্যবহারকারীদের জন্য দ্রুত ও আধুনিক সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

 

বন্দর কর্তৃপক্ষের আশা, বহুমাত্রিক পরিবহন সংযোগের সুবিধা কাজে লাগিয়ে তৈরি পোশাক, নিটওয়্যার, পাটজাত পণ্য, তাজা খাদ্যপণ্যসহ বিভিন্ন খাতের আমদানি-রপ্তানিকারকদের জন্য পৃথক কনটেইনার হ্যান্ডলিং সুবিধা নিশ্চিত করা যাবে।চীনা অর্থায়নে বাস্তবায়ন

প্রকল্পটির সূত্রপাত ২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর। ওই সময় চীনের রাষ্ট্রপতির বাংলাদেশ সফরকালে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা চুক্তিতে প্রকল্পটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

 

পরবর্তী সময়ে ২০২১ সালের ২৬ আগস্ট চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিসিইসিসির সঙ্গে জি-টু-জি পদ্ধতিতে চীনা অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তায় প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। ২০২৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। একই বছরের ২৫ মার্চ মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ ও সিসিইসিসির মধ্যে বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

 

প্রকল্পের অর্থায়নের বিষয়ে চলতি বছরের ২৫ জুন প্রধানমন্ত্রী চীন সফরকালে চায়না ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন এজেন্সি (সিআইডিসিএ) ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) মধ্যে ফ্রেম ওয়ার্ক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর ধারাবাহিকতায় গত ১০ অক্টোবর বাংলাদেশ সরকার ও চায়না এক্সিম ব্যাংকের মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ৫৯২ কোটি ৯০ লাখ টাকার ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

 

বাড়বে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে মোংলা বন্দরে জাহাজ চলাচল ও পণ্য পরিবহনের পরিমাণ বাড়বে। একই সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ, শিল্প বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

 

আধুনিক বন্দর অবকাঠামো ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনা চালুর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়বে। পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও যোগাযোগ সম্প্রসারণেও মোংলা বন্দর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।

 

সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, প্রস্তাবিত চীনা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং আধুনিক বন্দর অবকাঠামোর সমন্বয়ে ভবিষ্যতে মোংলা বন্দর সামুদ্রিক বাণিজ্য, শিল্প বিনিয়োগ ও আঞ্চলিক লজিস্টিকস কার্যক্রমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হবে।

Show less

Related Articles

Back to top button