খাগড়াছড়িপার্বত্য অঞ্চল

পাহাড়ি ঐতিহ্যের অলংকারে স্বপ্ন গড়ছেন তরুণ উদ্যোক্তা দীপ্তি চাকমা

স্টাফ রিপোর্টার, খাগড়াছড়ি :
পাহাড়ের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং নান্দনিকতার এক গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলো পাহাড়ি নারীদের ঐতিহ্যবাহী অলংকার। যুগ যুগ ধরে এসব অলংকার কেবল সাজসজ্জার উপকরণ নয়; বরং এগুলো পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর পরিচয়, ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল প্রতীক। বিয়ে, উৎসব কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানে পাহাড়ি নারীদের সাজে এসব অলংকার বিশেষ মাত্রা যোগ করে।

 

এই ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার পাশাপাশি নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে এগিয়ে এসেছেন খাগড়াছড়ির এক তরুণ নারী উদ্যোক্তা,দীপ্তি চাকমা।

 

অনলাইন ব্যবসা দিয়ে শুরু করে আজ তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন নিজের একটি শো-রুম। সাহস, পরিশ্রম এবং আত্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে গড়ে তোলা এই উদ্যোগ আজ অনেক তরুণীর কাছে হয়ে উঠেছে অনুপ্রেরণার গল্প।
শৈশব থেকে স্বপ্নের বীজ

রাঙ্গামাটি জেলার কুতুকছড়ি ইউনিয়নের বাদলছড়ি এলাকার বাসিন্দা সতীশ চন্দ্র চাকমা ও শিখা চাকমা দম্পতির তিন সন্তানের মধ্যে বড় মেয়ে দীপ্তি চাকমা। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে রাঙ্গামাটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝে। ছোটবেলা থেকেই সাংস্কৃতিক পরিবেশের মধ্যে বেড়ে ওঠায় পাহাড়ি ঐতিহ্য, পোশাক ও অলংকারের প্রতি তার বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়।

 

বর্তমানে ব্যবসার প্রয়োজনে তিনি পরিবারসহ খাগড়াছড়ি জেলা সদরে বসবাস করছেন।

 

 

শিক্ষাজীবনে মেধাবী পথচলা:
শিক্ষাজীবনেও ছিলেন পরিশ্রমী ও মেধাবী। ২০১৩ সালে রাঙ্গামাটি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ২০১৫ সালে রাঙ্গামাটি মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য পরে রাজধানী ঢাকায় পাড়ি জমান তিনি। আশা ইউনিভার্সিটি, ঢাকা থেকে ২০২০ সালে অনার্স ডিগ্রি অর্জন করেন পরবর্তীতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০২২ সালে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। কিন্তু শুধু ডিগ্রি অর্জনেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখতে চাননি তিনি। ছাত্রজীবন থেকেই নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন ছিল তার।

 

অনলাইন ব্যবসা দিয়েই শুরু:
পরিবারকে সহযোগিতা করা এবং নিজের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তোলার ইচ্ছা থেকেই উদ্যোক্তা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন দীপ্তি চাকমা। এই ভাবনা থেকেই ২০১৭ সালের শেষ দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে “Ornaments of Dhanpudi (অর্নামেন্টস অব ধনপুদি)” নামে পাহাড়ি নারীদের ঐতিহ্যবাহী অলংকারের একটি অনলাইন ব্যবসা শুরু করেন তিনি।শুরুটা ছিল ছোট পরিসরে। কিন্তু ধীরে ধীরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার পণ্যের ছবি ও প্রচারণা মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে শুরু করে। ক্রেতারা অনলাইনের মাধ্যমে অর্ডার দিয়ে এসব অলংকার সংগ্রহ করতে থাকেন।

 

 

পাহাড়ের নারীদের ঐতিহ্যের অলংকার:
দীপ্তি চাকমার ব্যবসায় রয়েছে পাহাড়ি নারীদের বহুল ব্যবহৃত নানা ধরনের ঐতিহ্যবাহী অলংকার। তার সংগ্রহে রয়েছে—আলছড়া, আজুলি,হুজি হারু ঠেং হারু,বাজু,কয়েন মালা নেকলেস,টিকলি আংটি,চুড়ি এসব অলংকার শুধু বিয়ের অনুষ্ঠানেই নয়, বরং বিভিন্ন সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পাহাড়ি নারীদের সাজে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

 

অনলাইন থেকে অফলাইন শো-রুম:

অনলাইনে ব্যবসা শুরু করার পর ক্রেতাদের আগ্রহ ক্রমেই বাড়তে থাকে। অনেক ক্রেতা সরাসরি এসে পণ্য দেখার আগ্রহ প্রকাশ করতে থাকেন। ক্রেতাদের সেই চাহিদার কথা বিবেচনা করেই তিনি অফলাইনে একটি শো-রুম খোলার পরিকল্পনা করেন। অবশেষে ২০২৪ সালে খাগড়াছড়ি জেলা সদরের পানখাইয়া রোডের জামতলা এলাকায় “Ornaments of Dhanpudi” নামে একটি শো-রুম চালু করেন।বর্তমানে এখান থেকে খুচরা ও পাইকারি—উভয় দামে ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন ধরনের অলংকার বিক্রি করা হচ্ছে।

 

কর্মসংস্থানের সুযোগ: দীপ্তির এই উদ্যোগ শুধু ব্যবসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করেছে। বর্তমানে তার শো-রুমে দুইজন কর্মী কাজ করছেন। তাদের মধ্যে একজন খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজের অনার্সের শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি এখানে পার্টটাইম কাজ করে তিনি নিজের হাতখরচ চালাতে পারছেন।

 

পরিবারের সহযোগিতা:
দীপ্তির উদ্যোক্তা জীবনে পরিবারের সমর্থনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে তার স্বামী প্রমতোষ চাকমা এই ব্যবসায় তাকে সার্বিক সহযোগিতা করে আসছেন।পরিবারের এই সমর্থন তার পথচলাকে আরও শক্তিশালী করেছে বলে মনে করেন তিনি।

 

মাসে আয় প্রায় ৫০ হাজার :
বর্তমানে অনলাইন ও অফলাইন,দুই মাধ্যমেই সমানতালে চলছে তার ব্যবসা। সব মিলিয়ে মাসে প্রায় ৫০ হাজার টাকার মতো আয় হচ্ছে এই উদ্যোগ থেকে।তবে এখানেই থেমে থাকতে চান না দীপ্তি চাকমা। ভবিষ্যতে ব্যবসাকে আরও বড় পরিসরে বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে তার।

 

উদ্যোক্তাদের জন্য প্রয়োজন সহায়তা:
ব্যবসা সম্প্রসারণের পথে কিছু চ্যালেঞ্জের কথাও তুলে ধরেন তিনি। দীপ্তি চাকমা বলেন,“পাহাড়ের নারীদের অনেকেই উদ্যোক্তা হতে চান, কিন্তু মূলধনের অভাবে এগিয়ে যেতে পারেন না। সরকার যদি সহজ শর্তে স্বল্পসুদের ক্ষুদ্রঋণের ব্যবস্থা করে, তাহলে আমাদের মতো অনেক নারী উদ্যোক্তা ব্যবসাকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যেতে পারবে।”

 

ক্রেতাদের আস্থা:
তার শো-রুমের অলংকারের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহও চোখে পড়ার মতো। দীঘিনালা থেকে আসা ক্রেতা সুজাতা চাকমা বলেন, “বিয়েসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য আমরা প্রায়ই এখান থেকে অলংকার কিনি। এখানকার অলংকারের মান খুব ভালো এবং দামও আমাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে। তাই আমরা স্বাচ্ছন্দ্যেই এখান থেকে অলংকার কিনে থাকি।”

 

সরকারি কর্মকর্তার প্রশংসা:
দীপ্তি চাকমার এই উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা সুষ্মিতা খীসা।
তিনি বলেন,“দীপ্তি চাকমা খুব নিপুণভাবে পাহাড়ি নারীদের ঐতিহ্যবাহী অলংকার তৈরি ও বিপণন করছে। প্রতিটি অলংকারের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে এবং সে সেগুলো খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলছে। আমি নিজেও তার তৈরি অলংকার ব্যবহার করেছি এবং মান নিয়ে খুবই সন্তুষ্ট।”তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে দেওয়া ‘অদম্য নারী’ পুরস্কারের জন্য দীপ্তি চাকমাকে একজন সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

 

অনুপ্রেরণার আলোকবর্তিকা:

নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে ব্যবসা গড়ে তোলার এই উদ্যোগ শুধু একজন নারীর সফলতার গল্প নয়; বরং এটি পাহাড়ি নারীদের আত্মনির্ভরতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। পাহাড়ের ঐতিহ্যকে আধুনিক ব্যবসায়িক ধারণার সঙ্গে যুক্ত করে দীপ্তি চাকমা দেখিয়ে দিয়েছেন,সাহস, পরিশ্রম এবং স্বপ্ন থাকলে পাহাড়ের নারীরাও নিজেদের সাফল্যের গল্প নিজেরাই লিখতে পারে। তার এই পথচলা ভবিষ্যতের অনেক নারী উদ্যোক্তার জন্য হয়ে থাকবে অনুপ্রেরণার এক আলোকবর্তিকা।

Related Articles

Back to top button