
আজকের ভোরে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের নিস্তব্ধ কক্ষ থেকে ভেসে এলো এক যুগের সমাপ্তির খবর। মঙ্গলবার ভোর ছয়টা—ঢাকা যখন ঘুমচোখে জেগে উঠছে, তখনই দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া (৮০) জীবনের মহাপ্রস্থানে পাড়ি জমান। দীর্ঘদিন শারীরিক জটিলতায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পাশে ছিলেন বড় ছেলে তারেক রহমান, পুত্রবধূ ডা. জোবায়দা রহমান, নাতনি জাইমা রহমান, পরিবারের সদস্যরা এবং দলের শীর্ষ নেতারা। সবার চোখে ছিল শোক, বাকহীন বেদনাবোধ—যেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক বিশাল অধ্যায়ের অবসান হলো।
শৈশব, শিক্ষা ও ব্যক্তিজীবন
১৯৪৫ সালে জলপাইগুড়িতে জন্ম নেওয়া খালেদা খানম পুতুল পরবর্তীতে পরিবারের সাথে দিনাজপুরে স্থায়ী হন। দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাসের পর ১৯৬০ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এরপরই তিনি হয়ে ওঠেন ‘খালেদা জিয়া’—নামটি যার সাথে জড়িয়ে যায় রাজনীতি ও ইতিহাস।
মুক্তিযুদ্ধ ও জীবনের প্রথম বড় লড়াই
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি আত্মগোপন, গৃহবন্দী ও পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তারের অভিজ্ঞতা অতিক্রম করেন। সেই উত্তাল সময়ের প্রতিটি পদক্ষেপ যেন তাকে পরবর্তীকালের নেতৃত্বে প্রস্তুত করছিল নিঃশব্দে।
রাজনীতির ময়দানে উত্থান
১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর বিএনপির তুমুল অনিশ্চয়তার ভিতর তিনি এগিয়ে আসেন। ১৯৮৪ সালে তিনি হন দলের চেয়ারপারসন। সামরিক শাসনের বিরোধিতা, রাজপথের আন্দোলন, গ্রেপ্তার–হুলিয়া–জুলুম—সবকিছুকেই অটল দৃঢ়তায় মোকাবিলা করে তিনি মানুষের কাছে পরিচিত হন ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং সংসদীয় গণতন্ত্র ফেরানোর ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন।
শেষ অধ্যায় : হাসপাতালের বিছানায় লড়াই
লিভার সিরোসিস, কিডনি ও হৃদরোগসহ নানা জটিলতায় দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে ৩০ ডিসেম্বর ভোরে তিনি পরিপূর্ণ জীবন যুদ্ধের ইতি টানেন। বাংলাদেশসহ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও চীনের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ সত্ত্বেও তাকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।
সম্মাননা ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি স্টেট সিনেট তাকে প্রদান করে ‘ফাইটার ফর ডেমোক্রেসি’ পদক; ২০১৮ সালে কানাডিয়ান হিউম্যান রাইটস ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন তাকে সম্মানিত করে ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ উপাধিতে। যেখানে গণতন্ত্র, সেখানে তার নাম ইতিহাসের পাতায় এক অটল চিহ্ন হয়ে রইল।
শেষ প্রশ্নগুলো ইতিহাসের কাছে
তার প্রস্থান বিএনপির রাজনীতিতে নতুন সংকট ও পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ এনে দিল। তারেক রহমান দলের নেতৃত্বে এগিয়ে আসবেন—কিন্তু সেই আত্মিক বন্ধন, মাঠের টান, নেত্রীসুলভ ছায়া—তা কি আর ফিরবে? উত্তর দেবে সময় ও ইতিহাস।
সমাপ্তি
মানুষ মরণশীল—কিন্তু কেউ কেউ কর্মে অমর হয়ে থাকেন।
বেগম খালেদা জিয়া ঠিক সেই নাম—যার চলে যাওয়ায় সৃষ্টি হয়েছে এক পূরণহীন শূন্যতা।
শ্রদ্ধা ও বিদায়—আপসহীন নেত্রী।




