রাজনীতিশীর্ষ সংবাদ

মায়ের আঁচলে মুখ লুকিয়ে তারেক রহমানের ৯ মাসের বিভীষিকাময় বন্দিজীবন

কাঁটাতারের ভেতরে শৈশবের হারানো হাসি

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। আমাদের ইতিহাস লিখতে গেলে আমরা কেবল বড়দের সাহসিকতা, মুক্তি যোদ্ধাদের বীরত্ব আর রাজনীতিকদের দূরদর্শী সিদ্ধান্তের কথাই বলি। কিন্তু যুদ্ধের ক্যানভাসের একদম শেষ প্রান্তে, যেখানে আলো প্রায় পৌঁছায় না, সেখানেও কিছু ছোট মানুষ ছিল যুদ্ধের ভয়াবহতা তাদের ছোট্ট জীবনে ফেলেছিল এক দীর্ঘ ছায়া। তারেক রহমান, যার বয়স তখন মাত্র চার কি পাঁচ, যিনি রণাঙ্গনের আগুনঝরা দিনগুলোতে বন্দি ছিলেন ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের চার দেয়ালে। তার বাবা, মেজর জিয়াউর রহমান, তখন এক নম্বর সেক্টরের কমান্ডার। বাবার বিদ্রোহের চরম মূল্য দিতে হয়েছিল এই ছোট্ট শিশুটিকে। তারেকের জীবনের সেই নয়টি মাস ছিল বন্দুকের নল আর মায়ের চোখের জলের এক অবিশ্বাস্য উপাখ্যান।

 

 

২৫ মার্চের কাল রাতে যখন মেজর জিয়াউর রহমান বিদ্রোহ করলেন, তখন তারেকের জীবন বদলে গেল চিরতরে। তাদের সাজানো গোছানো সংসার, খেলার মাঠ সব যেন এক নিমেষে ভেঙে তছনছ হয়ে গেল। মায়ের হাত ধরে চট্টগ্রাম থেকে শুরু হলো এক জীবন-মরণ যাত্রা। ছদ্মবেশে, লুকিয়ে, কখনো আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে ঢাকায় পৌঁছানো। কিন্তু বাবা যেহেতু পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন, তাই রেহাই মেলার প্রশ্নই আসে না। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর শ্যেনদৃষ্টি ঠিকই খুঁজে বের করল এই পরিবারকে। তারেক রহমান, তার ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকো এবং তাদের মা বেগম খালেদা জিয়াকে বন্দি করা হলো ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের একটি বিশেষ বাড়িতে। শুরু হলো এক দীর্ঘ বিভীষিকাময় অধ্যায়।

 

একটি চার-পাঁচ বছরের শিশু। এই বয়সে শিশুরা সাধারণত নতুন খেলনা, গল্পের বই আর বাবার কোলে ঝুলে থাকার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু তারেকের জগৎ জুড়ে ছিল রাইফেল উঁচিয়ে থাকা পাহারাদার, অচেনা মানুষের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আর মায়ের মুখের চাপা আতঙ্ক। যে বাড়িতে তাদের রাখা হয়েছিল, সেটি ছিল এক প্রকারের কারাগার। উঁচু দেয়াল, কাঁটাতারের বেড়া, আর গেটে সর্বক্ষণ পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন। তারেক হয়তো একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখত, পরিচিত কোনো খেলার সঙ্গী নেই, নেই তাদের প্রিয় পোষা প্রাণীটিও। চারপাশটা নিস্তব্ধ, কেবল ভারী বুটের শব্দ আর উর্দুতে গার্ডদের ফিসফাস। এই নীরবতা শিশুদের জন্য আরও ভয়ানক। শিশুরা কোলাহল পছন্দ করে, কিন্তু এখানে ছিল কেবল স্তব্ধতা আর ভয়।

 

 

বন্দিজীবনে খাদ্য সংকট ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। শিশুদের জন্য পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা ছিল না। তারেক এবং তার ছোট ভাই কোকো (যার বয়স তখন আরও কম) অপুষ্টির শিকার হতে শুরু করল। চারপাশের পরিবেশ বিষণ্ণ, আনন্দ বলতে কিছু নেই। ছোট্ট তারেক হয়তো খেলনা চাইত, কিন্তু মা হয়তো তাকে পুরোনো কাপড় দিয়ে তৈরি একটি পুতুল দিতে পারতেন। এর চেয়েও বড় সমস্যা ছিল মানসিক চাপ। পাকিস্তানি গোয়েন্দা অফিসাররা মাঝে মাঝেই তাদের মাকে জেরা করতে আসত। তারা চেঁচাত, চিৎকার করত। এই দৃশ্য ছোট্ট তারেকের মনে কী প্রভাব ফেলেছিল, তা ভাবলেই শিউরে উঠতে হয়। হয়তো দরজার ফাঁক দিয়ে সে দেখত, মাকে ঘিরে ধরেছে অচেনা, লম্বা, গোঁফওয়ালা কিছু মানুষ—যারা বারবার বাবার খোঁজ করছে। বাবার নাম শুনলেই তাদের চোখ কঠিন হয়ে উঠত।

 

যুদ্ধের খবর ভেতরে পৌঁছাত না। বেগম খালেদা জিয়াও জানতেন না তার স্বামী বেঁচে আছেন কি না। এই চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে তারেক হয়তো বারবার তার মায়ের কাছে জানতে চাইত, “বাবা কখন আসবে? বাবা কেন আসছে না?” মায়ের পক্ষে তখন উত্তর দেওয়া সম্ভব ছিল না। তাকে নিজের চোখের জল লুকিয়ে বলতে হতো, “বাবা যুদ্ধে গেছে, দেশের জন্য লড়ছে। বাবা ফিরে আসবে, বাবা আমাদের বাঁচাবে।” কিন্তু মায়ের চোখে যে গভীর কষ্ট আর আতঙ্ক লুকিয়ে থাকত, তা ছোট্ট তারেকও হয়তো কিছুটা বুঝতে পারত। বাবার অনুপস্থিতি, চারপাশের বন্দিদশা সব মিলিয়ে তারেকের শিশুমনে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছিল। এই সময়ে শিশুরা নির্ভরতা খুঁজে নেয়, কিন্তু তারেকের নির্ভরতার জায়গাটি ছিল নড়বড়ে। মা ছাড়া আর কেউ ছিল না তাকে আগলে রাখার।

 

 

বন্দি জীবনের সবচেয়ে কঠিন দিক ছিল চিকিৎসা সংকট। তারেক বা কোকো যখন অসুস্থ হতো, তখন পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠত। জ্বরে কাতরাচ্ছে শিশু, কিন্তু ডাক্তার ডাকার অনুমতি নেই। কারণ, ডাক্তার মানেই বহিরাগত, বাইরে থেকে আসা মানুষ। পাকিস্তানিরা ভয় পেত, পাছে এই সুযোগে কোনো গোপন তথ্য বাইরে চলে যায়। অসহায় মা নিজের সীমিত জ্ঞান দিয়ে তাদের চিকিৎসা করার চেষ্টা করতেন। শিশুরোগে মায়ের এই অসহায়ত্ব তাকে মানসিকভাবে আরও দুর্বল করে দিত। এই সময়ে তারেককে হয়তো অনেক রাত নির্ঘুম কাটাতে হয়েছিল। বোমার শব্দে কান পাতা যেত না। নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে যখন যুদ্ধ চূড়ান্ত রূপ নেয়, তখন ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের আশপাশে বোমা পড়তে শুরু করে। প্রতিটি বোমার আওয়াজ ছিল ছোট্ট তারেকের জন্য এক একটি মৃত্যুর বার্তা। মা তাকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরতেন, হয়তো কানে কানে ছড়া বলতেন, কিন্তু সেই ছড়ার সুরও বোমার গর্জনে চাপা পড়ে যেত।

 

পাকিস্তানিরা তারেককে ব্যবহার করতে চেয়েছিল। তারা জানত, মেজর জিয়াকে দুর্বল করার একমাত্র উপায় হলো তার পরিবার। বিভিন্ন সময় তাকে বা তার ভাইকে ভয় দেখানো হতো। যদিও সরাসরি শারীরিক নির্যাতন হয়তো করা হতো না, কিন্তু ক্রমাগত ভয় দেখিয়ে, মানসিক চাপ সৃষ্টি করে শিশুদের মনে ট্রমা সৃষ্টি করা হতো। এক চার বছরের শিশুর কাছে বন্দুকের নল তাক করা আর গুলি চালানোর হুমকি এটাই ছিল চরম নির্যাতন। এই বয়সে শিশুরা যা দেখে, সেটাই তাদের মনে স্থায়ী ছাপ ফেলে। তারেকের কাছে ১৯৭১ সালের বন্দিজীবন ছিল আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা আর মৃত্যুভীতিতে ঠাসা।

 

 

শিশু তারেকের এই বন্দিজীবন ছিল নীরবে সংগ্রামের এক অন্যরকম দলিল। তারেক তার ছোট ভাইয়ের জন্য একটি অবলম্বন ছিল। সে হয়তো নিজেই ভয়ে কুঁকড়ে যেত, কিন্তু ভাইকে সাহস জোগাত। হয়তো মাকে দেখত লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদছেন, আর সে তখন সাহস করে মায়ের হাত ধরে বলত, “মা, আমরা চলে যাব, বাবা আসবে।” এই সাহস, এইটুকু প্রতিরোধ এই বন্দিশিবিরের নিস্তব্ধতায় ছিল এক বিশাল যুদ্ধ। এই শিশুটি অজান্তেই তার বাবার আদর্শের জন্য, দেশের স্বাধীনতার জন্য চরম মূল্য দিচ্ছিল। তারেক রহমান কেবল একজন সামরিক অফিসারের সন্তান হিসেবে বন্দি ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন বিদ্রোহী সন্তানের প্রতীক।

 

 

ডিসেম্বরের ১৬ তারিখ যখন দেশ স্বাধীন হলো, তখনো সেই বন্দি শিবিরের দরজা সহজে খোলেনি। পাকিস্তানিরা তখনো নিজেদের বাঙ্কারে লুকিয়ে ছিল। তারেক হয়তো দেখছিল, বাইরে থেকে আসা কিছু অচেনা সৈনিক (ভারতীয় ও মুক্তিযোদ্ধা) তাদের গেটে এসে দাঁড়িয়েছে। তার মা হয়তো ভয়ে চুপ করে ছিল, কারণ তখনও তাদের মধ্যে এক ধরনের অবিশ্বাস আর ভয় কাজ করছিল। সেই মুহূর্তে কারোরই জানা ছিল না, এই আগন্তুকরা বন্ধু নাকি শত্রু। অবশেষে, যখন তারা মুক্ত হলেন, তখন তারেকের চোখে ছিল মিশ্র অনুভূতি। আনন্দ নাকি ভয়? মুক্তি নাকি অবিশ্বাস? কারণ, তার কাছে মুক্ত পৃথিবী কেমন, তা সে ভুলেই গিয়েছিল। নয় মাসের দীর্ঘ কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তারেক রহমান হয়তো অবাক হয়ে বাইরে তাকাচ্ছিল এত আলো কেন ? এত শব্দ কেন ?

 

মুক্তিযুদ্ধের পর তারেক রহমান স্বাভাবিক জীবনে ফিরলেও, এই নয় মাসের বিভীষিকা তার মনোজগতে গভীরভাবে গেঁথে গিয়েছিল। এটি এমন এক অভিজ্ঞতা যা তাকে শৈশবে শিখিয়েছিল ধৈর্যের অর্থ, সাহসের গুরুত্ব এবং অনিশ্চয়তার সাথে কীভাবে লড়াই করতে হয়। একজন শিশু যখন জীবনের শুরুতেই এতোটা ভয়াবহতা দেখে, তখন তার মধ্যে এক ধরনের আত্মরক্ষার কৌশল এবং কঠিন পরিস্থিতিতে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা তৈরি হয়। এটি তারেক রহমানকে পরবর্তী জীবনে বহু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সাহায্য করেছে। তারেকের এই বন্দি জীবন ছিল সেই লাখো শিশুর প্রতিনিধিত্ব, যারা নিজেদের অজান্তেই যুদ্ধের শিকার হয়েছিল।

 

 

এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, স্বাধীনতা কেবল বন্দুকের নলের ডগায় জেতা হয়নি, এটি জেতা হয়েছিল বন্দি শিবিরে থাকা অসহায় মা ও তাদের শিশুদের নিরব আত্মত্যাগের মাধ্যমেও। তারেক রহমানের মতো শিশুরা কেবল একটি পরিবারকে দেখেনি, তারা দেখেছে একটি জাতির সংকটকালীন মুহূর্তের প্রতিচ্ছবি। তারা বেঁচেছিল, তারা সংগ্রাম করেছিল। কাঁটাতারের ভেতরে তাদের শৈশবের হারানো হাসি হয়তো আর ফেরানো যায়নি, কিন্তু সেই হাসি হারানোর মধ্য দিয়েই আমরা পেয়েছি আমাদের লাল-সবুজের পতাকা। তারেক রহমানের নয় মাসের এই বন্দি জীবন তাই কেবল একটি করুণ কাহিনি নয়, এটি আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ পাতা, যা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, স্বাধীনতার মূল্য কত রক্ত, কত চোখের জল আর কত অমানবিক ত্যাগের বিনিময়ে পরিশোধ করা হয়েছে

 

লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও সদস্য, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ।
 Email : msislam.sumon@gmail.com

 

 

Related Articles

Back to top button