খাগড়াছড়িপার্বত্য অঞ্চলসারাদেশ

খাগড়াছড়িতে স্বাবলম্বিতার পথে শতাধিক পরিবার

স্টাফ রিপোর্টার, খাগড়াছড়ি :
দুর্গম পাহাড়ি জনপদে দারিদ্র্য, বেকারত্ব আর অনিশ্চয়তার সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করা বহু পরিবারের জীবনে যেন নতুন সূর্যের আলো ফুটেছে। বছরের পর বছর সীমিত আয়ে সংসার টেনে নেওয়া, পুঁজি না থাকায় স্বপ্নকে থামিয়ে রাখা,এসব বাস্তবতার মাঝেই এলো এক মানবিক সহায়তা, যা শুধু আর্থিক সহযোগিতা নয়, বরং আত্মনির্ভরতার পথে দৃঢ় এক পদক্ষেপ।

 

২০২৫–২০২৬ অর্থবছরে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন সহায়তা কর্মসূচির আওতায় খাগড়াছড়িতে অসহায়, গরীব ও দুঃস্থ পরিবারের মাঝে গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগি বিতরণ এবং গৃহহীনদের নতুন ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচি এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

 

 

অনুষ্ঠানে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য জয়া ত্রিপুরা প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে তিনি উপকারভোগীদের মাঝে গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি, ঘরের ঢেউটিন বিতরণ করেন এবং গৃহহীন পরিবারের হাতে নতুন ঘরের চাবি তুলে দেন।

 

সহায়তা নিতে আসা পরিবারগুলোর চোখেমুখে ছিল স্বস্তি, কৃতজ্ঞতা আর ভবিষ্যতের আশাবাদ। অনেকের মুখেই শোনা যায়,“এবার হয়তো নিজের চেষ্টায় দাঁড়াতে পারবো।”

 

 

মাটিরাঙ্গা উপজেলার বিভিন্ন এলাকার অস্বচ্ছল পরিবারের মাঝে এদিন মোট ১০টি গরু বিতরণ করা হয়। পাশাপাশি ৫০টি পরিবারের মাঝে গরু ও ছাগল এবং ৫০টি পরিবারের মাঝে হাঁস-মুরগি প্রদান করা হয়। এছাড়া গৃহহীন ৩টি পরিবারকে নতুন ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে ১০০টিরও বেশি পরিবার সরাসরি এই সহায়তার আওতায় এসেছে।

 

পাহাড়ি অঞ্চলে কৃষি ও প্রাণি সম্পদ ভিত্তিক জীবিকা অত্যন্ত সম্ভাবনাময় হলেও পুঁজি ও উপকরণের অভাবে বহু পরিবার সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারে না। এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই এই কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

 

বিতরণ অনুষ্ঠানে জেলা পরিষদের সদস্য জয়া ত্রিপুরা বলেন, “পার্বত্য অঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর টেকসই উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হলো আত্মকর্মসংস্থান। গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগি পালন এমন একটি উদ্যোগ, যা অল্প পুঁজি দিয়েই একটি পরিবারকে স্বাবলম্বী করে তুলতে পারে। আজ আমরা যে পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছি, তাদের জীবনমান বদলাতে এ সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”তিনি আরও বলেন,”জেলা পরিষদের একজন ক্ষুদ্র প্রতিনিধি হিসেবে মানুষের পাশে দাঁড়ানো শুধু দায়িত্ব নয়, এটি আমার নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। দীর্ঘদিন ধরে গবাদি পশু বিতরণ, খেলাধুলার সামগ্রী প্রদান, অসহায়দের ঘরবাড়ি নির্মাণ, ঘরের টিন বিতরণ, অস্বচ্ছল শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা, মসজিদ-মন্দির ও বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সহযোগিতা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আসবাবপত্র ও বিদ্যুৎ-পানি সরবরাহ, দুঃস্থ নারীদের আত্মকর্মসংস্থানের জন্য সেলাই মেশিন ও তাঁত সামগ্রী প্রদান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠ সংস্কার, কালভার্ট ও পুকুর সংস্কারসহ খাগড়াছড়ির মানুষের যে কোনো সমস্যায় পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। মানুষের কাতারে দাঁড়িয়ে কাজ করলে যে মানসিক শান্তি পাওয়া যায়, তা অন্য কোথাও নেই।”

 

 

বেলতলী এলাকা থেকে আসা এক নারী উপকারভোগী আবেগঘন কণ্ঠে বলেন,“আমার স্বামীর আয় খুবই সীমিত। সংসার চালাতে কষ্ট হয়। এই গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগি পেয়ে আমরা এখন বাড়িতেই আয় করার সুযোগ পেলাম। জেলা পরিষদের এই সহায়তা আমাদের জীবনে বড় পরিবর্তন আনবে।”

 

আরেকজন উপকারভোগী বলেন,“দীর্ঘদিন ধরে অভাবের সঙ্গে লড়াই করছি। আজ যে সহায়তা পেলাম, তা দিয়ে ছোট পরিসরে খামার গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছি। যদি সবকিছু ভালোভাবে করতে পারি, তাহলে পরিবারের জীবনমান বদলে যাবে,এই বিশ্বাস এখন মনে জেগেছে।”

 

 

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, পার্বত্য অঞ্চলের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এমন উদ্যোগ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ প্রাণিসম্পদভিত্তিক ছোট উদ্যোগ দ্রুত আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করে এবং বিশেষ করে নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার পথ উন্মুক্ত করে।

 

স্থানীয়রা জানান, ধারাবাহিকভাবে এ ধরনের সহায়তা অব্যাহত থাকলে পার্বত্য অঞ্চলের দরিদ্র পরিবার গুলো আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠবে এবং মূলধারার অর্থনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হতে পারবে। দুর্গম পাহাড়ি পথ পেরিয়ে যখন সহায়তার সামগ্রী পৌঁছে যায় প্রান্তিক মানুষের হাতে, তখন তা শুধু একটি গরু, ছাগল বা হাঁস-মুরগি নয়,বরং হয়ে ওঠে স্বপ্নের বীজ, সম্ভাবনার সূচনা এবং নতুন জীবনের প্রতিশ্রুতি।

Related Articles

Back to top button