খাগড়াছড়ি সরকারি মহিলা কলেজে বসন্তের পিঠা উৎসব

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি :
পাহাড়ের বুকে বসন্তের হাওয়া মানেই অন্যরকম এক আবেশ। কুয়াশা ঝরা শীত পেরিয়ে নতুন পাতার সবুজে, ফুলের রঙে আর তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে যখন চারপাশ ভরে ওঠে, তখন বসন্ত কেবল একটি ঋতু নয়—হয়ে ওঠে অনুভূতির নাম।
সেই অনুভূতিকেই বুকে ধারণ করে ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, মঙ্গলবার খাগড়াছড়ি সরকারি মহিলা কলেজ-এ অনুষ্ঠিত হলো বর্ণাঢ্য বসন্ত বরণ ও পিঠা উৎসব। দিনব্যাপী এই আয়োজন রঙ, গান, ঐতিহ্য আর মিলনের এক অনন্য উৎসবে পরিণত হয়।
কলেজের অধ্যক্ষ পুলক বরন চাকমা’র সভাপতিত্বে আয়োজিত উৎসবের উদ্বোধন করেন শেফালিকা ত্রিপুরা, চেয়ারম্যান, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মো. আনোয়ার সাদাত, জেলা প্রশাসক। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন জেলা পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা নোমান হোসেন, জেলা প্রশাসনের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক সাজিয়া তাহের, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রুমানা আক্তার, জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তা হারুন-অর রশিদসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কলেজের শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং শত শত প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থী।
সকাল থেকেই কলেজ প্রাঙ্গণে ছিল উৎসবের আমেজ। বাসন্তী, লাল ও হলুদের মিশেলে শাড়ি, ফুলের খোঁপা আর রঙিন ওড়নায় সেজে ওঠা শিক্ষার্থীদের হাসিমুখে ফুটে ওঠে বসন্তের প্রতিচ্ছবি। পুরো ক্যাম্পাস যেন হয়ে ওঠে জীবন্ত রঙের ক্যানভাস। সেলফি, দলবেঁধে ছবি তোলা, হাসি-ঠাট্টা আর গল্পে মুখর ছিল চারপাশ। প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে তৈরি হয় আন্তরিক পুনর্মিলনী পরিবেশ—পুরোনো স্মৃতি আর নতুন স্বপ্নের মেলবন্ধনে দিনটি হয়ে ওঠে বিশেষ।
উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক আয়োজন। মঞ্চজুড়ে পরিবেশিত হয় দলীয় সংগীত “এসো হে বসন্ত…”, যার সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের নৃত্য পরিবেশনা দর্শকদের মুগ্ধ করে। বাংলার ঐতিহ্যবাহী গানের পাশাপাশি ছিল পাহাড়ি সংস্কৃতির মনোমুগ্ধকর পরিবেশনা। চাকমা, ত্রিপুরা ও মারমা সংস্কৃতির ছোঁয়ায় অনুষ্ঠান পায় ভিন্নমাত্রা। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অংশগ্রহণ আয়োজনকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে এবং ক্যাম্পাসে সৃষ্টি করে পারিবারিক আবহ।
উৎসব প্রাঙ্গণে শিক্ষার্থীদের স্টলে সাজানো ছিল নকশি পিঠা, অনথন, পুলি পিঠা, গাঁদা পিঠা, ডিম পিঠা, জামাই পিঠা, পকি, পাটিসাপটা সহ হরেক রকম ঐতিহ্যবাহী পিঠা। রঙিন সাজে উপস্থাপিত এসব স্টল ছিল স্বাদ ও নান্দনিকতার এক সুন্দর প্রতিযোগিতা।
এক শিক্ষার্থী হাসতে হাসতে বলছিলেন,“আমরা কয়েকদিন ধরেই প্রস্তুতি নিয়েছি। নিজের হাতে পিঠা বানিয়ে বিক্রি করছি—এটা আমাদের জন্য গর্বের।”
প্রাক্তন শিক্ষার্থী শ্রাবন্তী গুপ্ত বলেন,“বসন্ত আমাদের কাছে নতুন শুরুর প্রতীক। কলেজে ফিরে এসে আবার সেই পুরোনো দিনগুলো মনে পড়ছে।“আজকের এই মিলনমেলা সত্যিই অসাধারণ। কলেজটা শুধু পড়া লেখার জায়গা নয়, একটা পরিবার।”
জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত বলেন, শিক্ষার্থীদের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ দেখলে ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হওয়া যায়।
চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরা বলেন, এ ধরনের অনুষ্ঠান আমাদের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে।”
অধ্যক্ষ পুলক বরন চাকমা বলেন, “এ ধরনের আয়োজন শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।”
সবুজ পাহাড়, নির্মল বাতাস এবং রঙিন পোশাকে সজ্জিত শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে পুরো পরিবেশ ছিল উচ্ছ্বাসময়। এই উৎসব কেবল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়; এটি ছিল প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের মিলনমেলা—পুরোনো বন্ধুত্বের পুনর্জাগরণ, নতুন সম্পর্কের সূচনা এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুননের এক অনন্য সুযোগ।
তারুণ্য মানেই প্রাণ, তারুণ্য মানেই সৃষ্টির শক্তি—এই সত্যকেই যেন নতুন করে প্রমাণ করলো কলেজের বসন্ত বরণ ও পিঠা উৎসব। রঙে রঙে, হাসি-আনন্দে মুখর এই আয়োজন ছড়িয়ে দিল ভালোবাসা, বন্ধুত্ব ও সংস্কৃতির বার্তা। পাহাড়ে বসন্তের এই রঙিন উৎসব ছড়িয়ে দিক নতুন আশার আলো—মননে, সংস্কৃতিতে এবং জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে। স্মৃতির অ্যালবামে রঙিন হয়ে থাকবে দিনটি; আর আগামী বছর আবারও বসন্তের অপেক্ষায় থাকবে প্রিয় ক্যাম্পাস, প্রিয় মুখগুলো।




