হালদাপাড়ে তামাক বিকল্প কৃষি বিপ্লবের হাতছানি

মানিকছড়ি,খাগড়াছড়ি:
এশিয়া মহাদেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীর উজানে শাখা-প্রশাখার কূল ঘিরে গত দেড় দশকে চলমান থাকা তামাক চাষ থেকে সরে এসেছে প্রান্তিক কৃষক। দীর্ঘ দেড় দশকে তামাক কোম্পানির লোভনীয় অফারে থাকা তামাক চাষিদের বিকল্প জীবিকার উপার্জনে কৃষি বিভাগের পাশাপাশি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আইডিএফ এখানকার কৃষকদের বিকল্প চাষাবাদে মওসুমী সবজি, ফলজ বাগান, হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল, ধান-গম, আপেল কুল, আম, আনারসসহ নানা প্রকার চাষাবাদে প্রান্তিক কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়েছে। ফলে হালদাচরে শীতকালীন এবং গ্রীষ্মকালীন সবজিতে কৃষি বিপ্লবের হাতছানি দৃশ্যমান।
উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ গত বছরে খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি উপজেলার হালদা পাড়ে ১১ জন তামাকচাষীর প্রায় ২০ একর জুড়ে তামাক চাষের তথ্য রেকর্ড করা হয়েছিল। গত ৫ নভেম্বর, ২০২৫ হালদা নদী সংরক্ষণের গেজেটে হালদা পাড়ে তামাক চাষ নিষিদ্ধ করায় এ বছরের তামাক রোপন সময়ে তামাক চাষের সকল উদ্যোগ রহিত করতে সক্ষম হয়েছে সংস্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। যেসব প্রক্রিয়ায় তামাক চাষ নিরসন হয়েছে তারমধ্যে মৎস্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় খাগড়াছড়ি জেলা মৎস্য দপ্তর থেকে হালদা পাড়ে তামাকচাষীদের তামাক চাষ থেকে বিরত রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়। উদ্যোগ বাস্তবায়নে জেলা আইনশৃঙ্খলা ও মাসিক মিটিং-এ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা হালদা পাড়ে তামাক চাষ নিষিদ্ধের গেজেট বিষয়ে আলোকপাত করে প্রশাসন ও কৃষি ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সহযোগিতা কামনা করেন।
খাগড়াছড়ি জেলা মৎস্য কর্মকর্তার নির্দেশনায় মানিকছড়ি উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা উক্ত ১১ জন তামাক চাষীদের সাথে সরাসরি আলোচনা করে তামাক চাষ নিষিদ্ধের বিষয়ে অবগত করে হালদা পাড়ে তামাক চাষে না যাওয়ার পরামর্শ প্রদান করেন। মানিকছড়ি উপজেলায় হালদা পাড়ে তামাক চাষ নিষিদ্ধ ও উক্ত কার্য থেকে বিরত থাকার নিমিত্ত উপজেলায় ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়। ফলশ্রুতিতে এটি প্রান্তিক পর্যায়ের সকলের অবগতিতে আসে। মানিকছড়ি উপজেলায় তামাকচাষীদের অবগত করার পাশাপাশি কোন অনিয়ম যেন সংঘটিত না হয় সে বিষয়ে সার্বিক সময়ে গোপন নজরদারি রাখা হয়।
তামাক চাষ কোম্পানির সাথে জেলা পর্যায় থেকে আলোচনা করা হয়। হালদা পাড়ে তামাক চাষ থেকে বিরত থাকার বাধ্যবাধকতা জানিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। এক্ষেত্রে উক্ত কতৃপক্ষ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। হালদা পাড়ে তামাক চাষ নিরসনে কৃষি অধিদপ্তর সহ স্থানীয় প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট তামাক কোম্পানি, হালদা পাড়ের তামাকচাষী সকলের সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব, বিশেষ করে তামাক চাষে নিষিদ্ধকরণ গেজেট এর ভিত্তিতে জেলা মৎস্য দপ্তর, খাগড়াছড়ি ও উপজেলা মৎস্য দপ্তর, মানিকছড়ির সমন্বয়মূলক উদ্যোগে হালদা পাড়ে তামাক চাষ পুরোপুরি নিরসন করা সম্ভব হয়েছে।
৮ ফেব্রুয়ারী হালদার উজান গোরখানা, আছারতলী, বড়বিল এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বিলে বিলে প্রান্তিক কৃষকেরা নদীর চর ঘেঁষে বেগুন, বরবটি, লাউ, আলু, মরিচ, গম, কাঁকরোল চাষ দৃশ্যায়িত করেছে চর। অনেকে শীতকালীন সবজি তুলে এখন গ্রীষ্মকালীন সবজি চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন। এ সময় মো. নূর আলম বলেন, বিগত ১২/১৪ বছর আমরা তামাক চাষ করতাম! বিকল্প চাষাবাদে উৎসাহ পেয়ে এবং তামাকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে জানতে পেরে তামাক চাষ ছেড়ে দিয়েছি। সরকারি সহযোগিতা বা কৃষি বিভাগের পরামর্শ পেলে হালদাচরে কৃষি বিপ্লব সম্ভব।
আবদুল মজিদ নামের এক গম চাষি বলেন, হালদা পাড়ের মাটি খুবই উর্বর। আমিও অনেকের মতো তামাক চাষ ছেড়ে বিভিন্ন সবজি, ধান এবং প্রথমবারের মতো গম চাষ করেছি। আশা করি হালদার চরে গম ভালো হবে। আমার ২০ শতক জমিতে গমের ফলন ভালোই মনে হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জহির রায়হান বলেন, হালদা চরের প্রান্তিক কৃষক এক সময় তামাক চাষে ঝুঁকে পড়ছিল! তাঁদের তামাকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতনতার পাশাপাশি বিকল্প চাষাবাদে কৃষি, মৎস্য, প্রাণী সম্পদসহ সময়োপযোগী এবং কৃষি বিপ্লবমুখী চাষাবাদে প্রণোদনা সহ নানাভাবে সরকার কাজ করছে। এ বছর তামাক চাষ শুণ্য ঘোষণার পর এখন তামাক চাষ মুক্ত হালদাচর! কৃষকদের আমরা আধুনিক চাষাবাদে সম্পৃক্ত করছি।




